আমার কলিজার টুকরো, আজ আমার কাছ থেকে শত দূরে। এতটা উপলব্দি হয়নি কখনো আগে। অনেক সময় হয়, এই বুঝি আমি চিৎকার করে আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে কেঁদে উঠবো। কিন্তু চোখের অশ্রুটাকে সংবরণ করে নেই। আমি তো পাগল নই, আমি একজন সাধারণ মানুষ এবং আমি সুস্থ।
এখন ঠিকই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, বাবা কাহাকে বলে! কেন বা কি রকম স্নেহ-ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখে তার সন্তানকে। যখন মোবাইলে শুনতে পাই আমার মেয়ে অন্যদের কাছে বলে ‘বাবা কই’। তখন আর ঠিক থাকতে পারি না।
২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ তার দ্বিতীয় জন্মদিন। দুই বৎসর পূর্ন হবে। দেখতে দেখতেই সে বড় হয়ে যাচ্ছে। তার মা সারাদিন তানহা’র পিছনে পিছনে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে যায় যা আমি অনুভব করি। কিন্তু তাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, আরে না। আবার বলে তুমি একদিন সারাদিন বাসায় থাকো। সে দেখাতে চায়, আমার মেয়েটি কতটুকু শান্ত! কিন্তু আমি যেদিনই বা যে সময়ই বাসায় থাকি আমার মা’মনিটা আমার পিছু ছাড়তে সে রাজি নয়। সারাক্ষণ সে এটা কী বাবা? ওটা কী বাবা, বিসমিল্লাহ দেও বাবা। বাবা গেছে গা, বন্ধ হয়ে গেছে কত কী।
এই বয়সেই তার মোবাইল আসক্তি তার চরমে পৌছে গেছে। আমাকে কাছে পেলেই সে বায়না ধরবে বিসমিল্লাহ (ইসলামি গান) দেখবে। এমন করে ধরবে যে, তাকে না দিয়েও উপায় নেই। আমি তো বুঝতে পারি এটা তার চরম মোবাইল আসক্তি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, তাকে এই অভ্যাস থেকে বিরত রাখা লাগবে। আর তাই আমি তার কাছে খুব কম সময়ই থাকি। যাতে ধীরে ধীরে এটা ভুলে যেতে পারে।
বাবা-মেয়ের এই স্নেহ বন্ধন যে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে সেটা আমি বড্ড টের পাচ্ছি। আজি আমি যেমনটি করে তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখি, তার কথা ভাবি। ঠিক একই ভাবেই তো আমার বাবাও তেমনি স্বপ্ন দেখতো। সেই বাবা আজ বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত। অন্য ভাইদের চেয়ে আমাকে নিয়েই হয়তো আমার বাবা বেশি স্বপ্ন দেখতেন। সেটা বুঝতে পারি। বাবা চাইতেন আমি যেন, বাবার সেই হারানো প্রতিপত্তি, জমাজমি বা সম্পত্তি ফিরিয়ে আনতে পারি।
কিন্তু আমি এমন অপদার্থ যে, সবার চেয়ে বেশি পড়াশুনা করেও তেমন একটি চাকুরী জুটাতে পারি নি। তাও আবার ব্যাংকের যে চাকুরীটা হয়েছিল তা আমারই অদূরদর্শিতায় বা অজ্ঞতায় হারিয়ে ফেলি। বড় ভাইয়েরাও আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন এমনইভাবে বাবার মতই। কিন্তু আমার স্বপ্ন তো দেখকে নিয়ে, দেশের মানুষকে নিয়ে। অসহায় নিপীড়িত মানুষগুলোর মুখে আমি হাসি ফুটাতে চাই। তাদের মাঝে জ্ঞানের আলো বিলিয়ে দিতে চাই। সকলকে সুশিক্ষিত হওয়ার পথে উৎসাহ জুগিয়ে দিতে চাই।
আমার স্বপ্নতো এটাই যে, আমার পাড়াপ্রতিবেশিরা আদর্শ, সৎ ও যোগ্যতা সম্পন্ন হিসেবে গড়ে উঠুক। তারা মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে যাক। সত্যের ধারক বাহক হিসেবে নিজেদেরকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলুক।
আমার প্রিয় মা জননী, যিনি আজ আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেছে। তার প্রিয় মা জননীর চেয়েও কত বয়স্করাও আজও বেঁচে আছেন। আমার মায়ের জানাজা তারপর নিজ হাতে আমার মা’কে কবরে শুইয়ে দিয়েছি। চোখের কোনে অশ্রুবিন্দু জড়ো হয়ে তপ্ত তরু বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। চোখ দুটো আবছা হয়ে যায়। হে প্রভু, তুমি আমার মাকে জান্নাতবাসী করিও। সুন্দর একটি ঘর বানিয়ে দিও। যেথায় মায়ের কোন কষ্ট যেন না হয়।
একদিকে আমি ছেলে আবার অন্যদিকে সেই আমিও এখন বাবা’তে পরিণত হয়েছি। দুটি প্রজম্নের আমিও যেন সেতুবন্ধন। আমার মেয়েকে নিয়ে আমি যতই ভাবি ততই আমার বাবা-মায়ের কথা বেশি মনে পড়ে। এমনি করেই তো তারা আমাকে সেই শিশু বেলায় কোলে পিঠে করে শত ষন্ত্রণা সয়ে সয়ে লালন পালন করেছে। আজ তো শত চেষ্টা করেও সেই স্নেহময়ী মা’কে কাছে পাবো না। মায়ের সেই মমতা মাখানো কণ্ঠ শুনতে পাবো না।
আমার এ অবস্থানে যখন তুমি পৌছুবে তখন তুমিও কী সেভাবেই চিন্তা করবে? হয়তো হবে নয়তো না। তবে আশাবাদী তুমিও স্বরণ করবে। আর সকল চিন্তাশীল ব্যক্তিগণই নিজের অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। ভাবে তার পরিবার-পরিজন, নতুন প্রজন্ম কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে। চিন্তাশীল ব্যক্তিগণই সফলকাম হয়। যদি তারা সঠিকভাবে চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।
সবশেষে আমার আদরের সন্তানকে বলতে চাই। তুমি কখনো সত্য পথ হতে বিচ্যুৎ হয়ো না। যদিও পাহাড়সম বিপদ সন্মুখে হাজির হয়। কারণ এই বিপদ থেকে সেই মহান আল্লাহ তায়ালাই রক্ষা করতে পারেন। আমরা তারই গোলাম। সর্বান্তকরণে শুধু তারই নিকট মস্তক অবনত করি।।
Comments
Post a Comment